ঘুম ঘুম চোখে সাহসী কথা

Published Date: Wednesday, June 3, 2020
ঘুম ঘুম চোখে সাহসী কথা

লেখক: Tonmoy Imran

বাংলা গল্প বা উপন্যাসের দিকে যখন তাকাই, হতাশা বোধ হয়। চরিত্রের গভীরতা ও মায়া আছে। গল্পের চমৎকারিত্ব আছে। ভাষার গভীরতা আছে। শব্দশৈলী আছে। সমাজ বাস্তবতা আছে। রাজনীতি, সমাজ দর্শন… কী নেই! হ্যা সব আছে। নেই কেবল একটা ঘোর লাগানো জগৎ। এমন একটা একটা জগৎ যেটা এই দুনিয়ার থেকে আলাদা কিছু। সে জগতে থাকা যায়, ঘুমানো যায়, সেখানকার সবকিছু আলাদা। গুপী-বাঘা কিংবা প্রফেসর শঙ্কু একটা জগৎ তৈরি করেছিল। এখানে বলে রাখি, উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী, সুকুমার রায় ও সত্যজিৎ-কে আমি একারণে আলাদা চোখে দেখি।

তাদের মতো ফ্যান্টাসির এমন জগৎ তৈরি করতে, যেখানে নিজেকে রাখা যায়, বাংলা সাহিত্যে আমার চোখে পড়েনি। বাংলা সাহিত্যের বড়দের গল্প/উপন্যাসে এরকম আলাদা জগৎ কেউ তৈরি করতে পেরেছে বলে জানা নেই। হয়তো আমার পড়ার ঘাটতি রয়েছে। অদ্ভুত হলেও সত্যি- ফ্যান্টাসি সম্ভবত আমাদের ক্রিটিক এবং পাঠকরাও নিতে পারেন না। এখন যে কেউ বলতে পারে, কেন মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা তো লোকে নিচ্ছে- যা ফ্যান্টাসি।

হুম নিচ্ছে, ফ্যান্টাসিও বটে। আমি তার লেখা খুব পছন্দ করি, সেটাও সত্যি। কিন্তু তার লেখা হ্যারি পর্টারের মতো আলাদা জগৎ তৈরি করে না। তার লেখায় নয়া আইডয়া খুঁজে পাই না।

নিক পিরোগ নামের একজন তরুণ মার্কিন লেখক আছেন। হেনরি বিন্স তার ‘থ্রি এ এম’ নামের সিরিজের নায়ক। নায়ক ২৩ ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকে, ১ ঘণ্টা জেগে থাকে। এই যে সে একঘণ্টা জেগে থাকে- এর মধ্যেই যাবতীয় কাহিনী, তার বেঁচে থাকা, সংগ্রাম, অ্যাডভেঞ্চার ইত্যাদি ইত্যাদি। একটা আলাদা ঘোরের জগৎ, একটু আলাদাভাবে জীবনকে দাঁড় করানো- যেখানে ফ্যান্টাসিটাই শুরু একটা থিম বা আইডিয়ার উপর। বৈশ্বিক উদাহরণ টানলে হ্যারি পর্টারের মতো গেইম অভ থ্রন্স, লর্ড অভ দ্য রিংস, হবিট- এরকম কতো কতো জানা বা অজানা দৃষ্টান্ত রয়েছে। অথচ মহাভারত বা রামায়ণ দিয়ে বাংলা (হ্যা আমি বাংলাই বলবো) ফ্যান্টাসির যাত্রা শুরু হয়েছিল। সেখানে এই যুগে এসে ভাণ্ডারটা শুন্যই রয়ে গেল! কেউ কেউ বলবে- ফ্যান্টাসির দরকারটা কী! গাঁজাখুড়ে আলাদা জগৎ এর মানে নেই। আমি বলি- মানুষের চিন্তার যে সীমা সেটার পরিমাপ হচ্ছে ফ্যান্টাসি। শিশুর, বড় মানুষের, বৃদ্ধের চিন্তার সীমা চিহ্নিত করে ফ্যান্টাসি।

চিন্তার সীমা বাড়ানোর প্রয়োজন কী? না, নেই। করে খাওয়ার জন্য, সেলাই মেশিন চালানোর জন্য, বিদেশে গিয়ে রেমিটেন্স যোদ্ধা হওয়ার জন্য চিন্তার সীমারেখা বাড়ানোর দরকার নেই। ভালো রেজাল্ট, বিজ্ঞাপন, মার্কেটিং স্ট্রাটেজি তৈরি- ইত্যাদির জন্য চিন্তার সীমারেখা খুব একটা না বাড়ালেও চলে। কেননা, চিন্তার সীমারেখা বা ফ্যান্টাসির জগৎকে সেসব জাতি গুরুত্ব দেয়, যারা বোঝে আরো একধাপ (দমন বা নিপীড়ণ, বা মানব কল্যাণে) এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।

সায়েন্স ফিকশনের ‘বাপ’ আইজাক আজিমভের চিন্তার সীমা দিয়ে বোঝা যায়- সামনের দিনের বিজ্ঞান আসলে কী চিন্তা করছে, ধনী দেশগুলো কী চিন্তা করছে, বিজ্ঞানমনষ্ক মানবকল্যাণকামী ও পরিবেশবাদীরা কোন রাস্তায় এগোচ্ছেন! আলোচনা জটিল ও গুরুগম্ভীর হয়ে যাচ্ছে। খালি এটুকু বলবো- বাংলায় ভালো ফ্যান্টাসি সাহিত্য নেই বলেই- আমাদের আস্তিক বা নাস্তিকদের আলোচনা সৃষ্টিকর্তা আছেন কি নেই- এই ফ্যান্টাসি নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আমাদের ফ্যান্টাসি সাহিত্য নেই বলেই, নিজের পিএইচডি ডিগ্রির থিসিসে চুরি করি, ফেইসবুকে আরেকজনের গল্প/লেখা/কবিতা মেরে নিজের নামে চালাই। আমাদের ফ্যান্টাসি জগৎ নেই বলে আমরা নতুন করে ভাবতে পারি না। করোনাভাইরাসের সময়টাতেও বাকিরা কী করছে সেটা নকল করেই কাটালাম!

সবচেয়ে বড় কথা কল্পনার সীমাবদ্ধতা আমাদের আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত এবং সামরিক শাসনের বাইরে যেতে শেখায়নি। কেননা আমরা এর বাইরের কোনো জগৎ ভাবতে অভ্যস্ত না।

ঠিক যতোদিন এই দেশের শিশুরা/যুবারা/বৃদ্ধরা উদ্ভট-উৎকট চিন্তার জন্য সমাদৃত না হবে, ততোদিন দেশ আগাবে না। Ig nobel prize নামে নোবেলকে বিদ্রুপ করে একটা পুরস্কার চালু আছে ১৯৯১ সাল থেকেই৷ এতো দুর্দান্ত মজার মজার আবিষ্কার! আবিষ্কারগুলো কিন্তু আবার খুব কেজো, ফেলনা নয়। আমার খুব ভালো লাগে৷ মানুষ হাসানোর এই প্রাইজটি তারাই পান যাদের কল্পনার সীমারেখা দুর্দান্ত। ফ্যান্টাসি সাহিত্য এই জায়গাটি তৈরি করতে পারে। একেবারেই মনোযোগ না পাওয়া সাহিত্যের এই দিকটা নিয়ে বাংলা সাহিত্যিকরা ভাবেননি কারণ তাদেরও চিন্তার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কেননা তারা তো আর এই দেশে মঙ্গলগ্রহ থেকে আসেননি! তাছাড়া ফ্যান্টাসি লেখা বেশ পরিশ্রমেরও কাজ।

ঘুম ঘুম চোখে সাহিত্য নিয়ে বড় বড় কথা বলার জন্য দুঃখিত। আমি মার্কেটিং এর ছাত্র। কাজেই সামনে যে ফ্যান্টাসি লিখবো সেটার একটু বাজার ঠিক করে নিলাম আর কি!

তবে ঘুম ঘুম চোখেই মানুষ সাহসী কথা অবলীলায় বলে ফেলতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Recent Posts

Popular posts:

google ad

Calender

July 2020
M T W T F S S
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031